চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি থেকে একই পরিমাণ আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের ডিএপি আমদানি অনিশ্চয়তায় পড়েছে। চলতি মাসে এক লট (৪০ হাজার টন) ডিএপি আমদানির কথা থাকলেও বিএডিসি তা না আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি সংস্থাটির দাবি, দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় মার্চে ডিএপি আমদানির প্রয়োজন নেই। তবে বিএডিসির একটি সূত্র এ প্রতিবেদককে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে বিকল্প উৎস দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে চীন ও মিসর বাংলাদেশকে ডিএপি কেনার প্রস্তাব দিয়েছে।
কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরিয়ার পরই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডিএপি সার। এটি জমি তৈরি ও চাষের শুরুর দিকে বেশি প্রয়োজন হয়। চলতি বোরো মৌসুমে ডিএপির সংকট দেখা না দিলেও জুনে আমনের মৌসুম শুরু হলে চাহিদা বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সৌদি আরব থেকে আমদানি বন্ধ থাকলে এবং বিকল্প উৎস থেকে না আনা গেলে তখন ডিএপি সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডিএপি সার মূলত জমি তৈরি করার সময় বেশি লাগে। সামনে আমন ও আউশ মৌসুম আসছে, তার আগেই এ বিষয়ে ভাবতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধান না হলে আমাদের বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক সার ও সেচের জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দাম বেড়ে গেছে। আমাদের দেশে এমনিতেই বোরো মৌসুমের শুরু থেকে কৃষকরা সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা বেশি দামে কিনছেন এবং চাহিদার চেয়ে কম সার পাচ্ছেন। এ প্রেক্ষাপটে সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে কৃষির উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, দেশে বছরে ১৫-১৬ লাখ টন ডিএপি সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীন ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) বছরে ১ লাখ টন সার উৎপাদন করে। বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। আর আমদানির বেশির ভাগ করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। অল্প কিছু আমদানি বেসরকারি খাতের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
বিএডিসির ক্রয় বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) ২৬ লাখ টন সার আমদানি করবে বিএডিসি। এর মধ্যে ডিএপি রয়েছে ১১ লাখ ৭৬ হাজার টন। এছাড়া ৮ লাখ ৫৯ হাজার টন মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) এবং সাড়ে ছয় লাখ টন ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি)।
বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব, চীন ও মরক্কো থেকে ডিএপি আমদানি করে। গত বছর চীন থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার টন আমদানি করা হয়েছে। নন-ইউরিয়া সারের নিরাপদ মজুদের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের কোম্পানি মা’অ্যাদেনের সঙ্গে বছরে ছয় লাখ টন ডিএপি সার আমদানির চুক্তি করে বিএডিসি। যে চুক্তির অধীনে ২০২৫ সালে ছয় লাখ টন ডিএপি কিনেছে বিএডিসি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর সময়ে ছয় লাখ টন আমদানির কথা রয়েছে।
বিএডিসি বলছে, প্রতি মাসে ৪০ হাজার টনের একটি করে লট আসার কথা সৌদি আরব থেকে। প্রতি মাসে ৪০ হাজার টন হিসেবে ৪ লাখ ৮০ হাজার টন এলেও বাকি সার বছরের যেকোনো সময় কিনে ছয় লাখের কোটা পূরণ করা হবে। তবে জানুয়ারির এক লট সার ফেব্রুয়ারির শেষদিকে রওনা হয়ে মার্চের শুরুতে দেশে পৌঁছেছে। আর মার্চে আরেক লট নেয়ার কথা থাকলেও বিএডিসি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে সেই লট না নেয়ার কথা জানিয়েছে। তারা আবার এপ্রিলে কোম্পানিটি থেকে সার কিনবে।
চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় মার্চের লটটি নেয়া হচ্ছে না জানিয়ে বিএডিসির মহাব্যবস্থাপক (ক্রয়) আহমেদ হাসান আল মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চুক্তি করা মানেই সব সার নিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। এ চুক্তি সার পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করে। আশা করি, এ বছর সৌদি থেকে ছয় লাখ টনই নেয়া হবে। বিএডিসির কাছে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। সেজন্য মার্চে এক লট নেয়ার কথা থাকলেও সেটি নিচ্ছে না। এপ্রিলে আবার নেয়া হবে। চাহিদামাফিক বছরের বিভিন্ন সময় সারের আমদানি কম-বেশি হয়।’
মার্চের শুরুতে সৌদি থেকে এক লট ডিএপি এসেছে জানিয়ে বিএডিসির সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ব্যবস্থাপক (পরিবহন) মোহাম্মদ খসরু নোমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৩ মার্চ সৌদি আরব থেকে আমদানি করা এক লট সার দেশে পৌঁছেছে।’
দেশে ইউরিয়া সার আমদানি ও উৎপাদন করে থাকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। আর নন-ইউরিয়া তথা ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি আমদানি করে বিএডিসি। ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) উৎপাদিত এক লাখ টন সার কৃষি মন্ত্রণালয়ের চাহিদা ও নির্দেশনামতো ডিলারদের কাছে হস্তান্তর করে।
জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার ও আরব আমিরাত—এ তিন দেশ থেকে সার আমদানি করে বাংলাদেশ। কাতার ও আমিরাত থেকে শুধু ইউরিয়া এবং সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া ও ডিএপি আনা হয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎসগুলো থেকে বেশি পরিমাণ সার আমদানির কথা ভাবছে সরকার। চীন ও মিসরের দেয়া সার আমদানির প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা চলছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে কেন্দ্র করে নয়। আগেই এসব দেশ প্রস্তাব দিয়েছিল। এখন বাংলাদেশ নিজেদের সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএডিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চীনের সঙ্গে বছরে ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিএপি আমদানির চুক্তি ছিল। সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে ৪০ হাজার টন বাড়িয়ে বছরে ৩ লাখ ২০ হাজার টন ডিএপি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে নতুন চুক্তির কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ‘মিসর তিন লাখ টন করে ডিএপি ও টিএসপি দেয়ার (রফতানি) প্রস্তাব দিয়েছে। তিন লাখ টন টিএসপি আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। আর ডিএপি নিয়ে মৌখিক প্রস্তাব পাওয়ায় আলোচনা তেমন এগোয়নি।’
জানা গেছে, চীন ও মিসরের পাশাপাশি দুবাইও দুই লাখ টন করে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশকে। তারা অন্য দেশ থেকে বাংলাদেশে সার পাঠানোর কথা বলেছে। এ প্রস্তাবগুলো নিয়েও আলোচনা চলছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে যে পরিমাণ সারের মজুদ রয়েছে তা দিয়ে মে-জুন পর্যন্ত কৃষিকাজ চলতে পারবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দেশে সারের ঘাটতি হবে না। আর আমদানি নিয়ে আলোচনার বিষয়টি ধারাবাহিক কাজেরই অংশ।
গত ৬ মার্চ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার যুগ্ম সচিব মো. খোরশেদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে ৪ লাখ ৮১ হাজার টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ৮৩ হাজার টন টিএসপি, ৪ লাখ ৭১ হাজার টন ডিএপি ও ৩ লাখ ৪৯ হাজার টন এমওপি মজুদ রয়েছে। এ পরিমাণ সার দিয়ে আগামী মে থেকে জুন পর্যন্ত সরবরাহ দেয়া যাবে।’
আমদানির পাশাপাশি দেশেও ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সার উৎপাদিত হয়। যদিও গ্যাস সংকটের কারণে গত ৪ মার্চ থেকে দেশের ছয়টির মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া কারখানায় সার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তবে টিএসপি ও ডিএপির কারখানা চালু রয়েছে।
সরকারি ডিএপি সার কারখানা ডিএপিএফসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) রবিউল আলম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কারখানায় বার্ষিক ১ লাখ ৪০ হাজার টন ডিএপি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে চলতি অর্থবছর এক লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এরই মধ্যে ৪৮ হাজার টন উৎপাদন হয়েছে।’
মন্তব্য জানতে বিএডিসি চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলামকে মোবাইলে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
সার্বিক বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে দেশে সারের কোনো সংকট নেই। পরের মৌসুমেও যেন কোনো প্রভাব না পড়ে সেজন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া হবে।’